চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের প্রতিটি বাঁক যেন একেকটি মৃত্যুফাঁদ। আর এই ফাঁদগুলো আরো বেশি ঝুঁকিপুর্ণ করে তোলে লবণের গাড়ি থেকে পড়া পানি। এ মহাসড়কে লোহাগড়া চুনতি জাঙ্গালিয়া এলাকায় বাস ও দুই মাইক্রোবাসের সংঘর্ষে গতকাল বুধবার সকালের দিকে ঘটনাস্থলেই সাতজন নিহত হয়েছেন। পাঁচজনকে লোহাগড়া হাসপাতালে নেয়া হলে একজন মারা যান। চারজনকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হলে দুইজন সেখানে মারা যান।
এরআগে ঈদের দিন সোমবার দুই বাসের সংঘর্ষে পাঁচজন নিহত হন। এরপর দিন মঙ্গলবার বাস খাদে পড়ে ১৫ জন আহত হন। এ মহাসড়ক কতটা ঝুঁকিপূর্ণ তা আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে তিনদিনের এসব দুর্ঘটনা।
হাইওয়ে পুলিশের কাছে এ সড়কে বছরে ১০০ থেকে ১২০ জনের প্রাণহানির তথ্য রয়েছে। পুলিশ ও যাত্রী কল্যাণ সংস্থা বলছে, চট্টগ্রামের নতুন ব্রিজ থেকে কক্সবাজারের কলাতলী পর্যন্ত ১৫০ কিলোমিটার মহাসড়ককে সড়ক দুর্ঘটনার জন্য তিনটি ভাগে ভাগ করা যায়। একটি হলো মইজ্জারটেক থেকে দোহাজারী শঙ্খ নদের ব্রিজ পর্যন্ত। সাতকানিয়ার কেরানীহাট থেকে রামু সংযোগ সড়ক পর্যন্ত দ্বিতীয়টি। আর চকরিয়া থেকে পটিয়ার ইন্দ্রপোল পর্যন্ত তৃতীয়টি।
প্রথম অংশ মইজ্জারটেক থেকে শঙ্খ নদের ব্রিজ পর্যন্ত ৪৫ কিলোমিটার মহাসড়কে থাকা অন্তত ৫০টি বাঁকের ৩০টিকে ঝুঁকিপুর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে হাইওয়ে পুলিশ। এরমধ্যে মইজ্জারটেক, পটিয়া-আনোয়ারা ক্রসিং, মনসারটেক, বাদামতলটেক, গৈড়লারটেক, আমজুর হাট, পটিয়া পোস্ট অফিস, আদালত গেট মোড়, থানার মোড়, ডাকবাংলোর মোড়, বাসস্টেশন, কমল মুন্সির হাট অন্যতম। দ্বিতীয় ভাগে সাতকানিয়ার কেরানীহাটের কিছু পর থেকে রামু সংযোগ সড়ক পর্যন্ত সড়কের অধিকাংশ এলাকায় দুই পাশে প্রচুর গাছ, পাহাড় ও সংরক্ষিত বনাঞ্চল হওয়ায় স্বাভাবিকের চেয়ে দুই থেকে তিন ডিগ্রি তাপমাত্রা কম থাকে। ফলে ওই এলাকায় ভোরের দিকে কুয়াশা বেশি থাকে।
এ ছাড়া চকরিয়া থেকে পটিয়ার ইন্দ্রপোলের লবণ কারখানা পর্যন্ত ৭৬কিলোমিটার এলাকা বেশি ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে লবণের গাড়ি থেকে পড়া পিচ্ছিল পানি। মহেশখালী, পেকুয়া ও কক্সবাজারের খুরুশকূল এলাকায় চাষ হওয়া কাঁচা লবণ মাঠ থেকে নেওয়া হয় পটিয়ার ইন্দ্রপোলের লবণ কারখানায়। শীত মৌসুমে প্রতি রাতে অন্তত ২০০ ট্রাক লবণ আসে পটিয়ায়।
চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রুটে নিয়মিত চলা যাত্রীবাহী গাড়ির চালক আজমত উল্লাহ জানান, লবণের ট্রাক থেকে পড়া পানি রাস্তায় জমে থাকা ধুলার সঙ্গে মিশে একটি পিচ্ছিল আবরণ তৈরি করে। কোনো গাড়ি হঠাৎ ব্রেক করলে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সড়কের ওপরই ঘুরে যায়। তিনি জানান, ভোর ৪টা থেকে সকাল ৯টা পর্যন্ত লবণপানির ঝুঁকি থাকে সবচেয়ে বেশি। কারণ, রাত ৩টার পর লবণ পরিবহন করা হয়। রোদের তেজ বাড়ার আগ পর্যন্ত সড়ক পিচ্ছিল থাকে। চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কে ঘটা দুর্ঘটনাগুলোর অন্তত ৭০ ভাগই ঘটে এই সময়ের মধ্যে।
নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এক কর্মী জানান, বর্তমানে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কে প্রচুর অবৈধ যানবাহন চলাচল করে। পুলিশকে চাঁদা দেওয়ার ফলে বেশিরভাগ যানবাহনের নামে তারা মামলা দেয় না। ২০২৩ সালে একটি বেসরকারি সংস্থা চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রুটে চলা সরকারের নিষিদ্ধঘোষিত ২২ ক্যাটাগরির যানবাহনসহ ফিটনেস ও রুট পারমিট না থাকা গাড়িগুলোর তালিকা করে। ওই সময় অবৈধ গাড়ির সংখ্যা ছিল প্রায় ৪৮ হাজার। বর্তমানে এ সংখ্যা কয়েকগুণ বেড়েছে। মহাসড়কে দুর্ঘটনা বৃদ্ধির এটিও একটি কারণ।
হাইওয়ে পুলিশের কুমিল্লা রিজিয়নের পুলিশ সুপার খায়রুল আলম বলেন, বেশিরভাগ দুর্ঘটনা ঘটে দূরপাল্লার গাড়িগুলোর সঙ্গে। এর বড় কারণ দীর্ঘ সময় গাড়ি চালাতে গিয়ে চালকরা ক্লান্ত হয়ে পড়েন। এ ছাড়া মহাসড়কগুলোর সঙ্গে সার্ভিস সড়ক না থাকায় নিষিদ্ধ গাড়ির চলাচল বন্ধ করা সম্ভব হয়নি বলে জানান তিনি।
তিনি বলেন, ঈদ বা পূজার মতো উৎসব-পার্বণে কক্সবাজারকেন্দ্রিক পর্যটকের চাপ বৃদ্ধি পায়। এসব যানবাহনের চালকরা দূর-দূরান্ত থেকে আসায় মহাসড়কের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে অবগত নন। লবণপানির ভয়াবহতা ও ঝুঁকিপূর্ণ বাঁকগুলোতে সাবধানতা অবলম্বন না করায় দুর্ঘটনা বেশি ঘটে।
যাত্রী কল্যাণ সংস্থার মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, গত ১৬ বছরে আওয়ামী লীগ সরকারের অপরিকল্পিত উন্নয়নে চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত মহাসড়কের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অন্তত ২০০ সংযোগ সড়ক। এ ছাড়া মহাসড়কে নিষিদ্ধঘোষিত ২২ ক্যাটাগরির যানবাহন চলাচলেও নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হয়নি রাজনৈতিক কারণে। গত ১৬ বছর সংস্কারের নামে যে টাকা ব্যয় করা হয়েছে, পরিকল্পিতভাবে তা খরচ করলে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কটিকে চার লেনে উন্নীত করা সম্ভব হতো। দুই লেনের সরু সড়কে বেপোরোয়া গতিতে গাড়ি চলায় দিন দিন দুর্ঘটনা বাড়ছে।
Comments 0