জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপি আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেছেন, নির্বাচনের ক্ষেত্রে আমরা বলছি, সামনের নির্বাচনটা একইসঙ্গে আইনসভা ও গণপরিষদ নির্বাচন করা সম্ভব। এর মাধ্যমে একটা নতুন সংবিধান এবং গণতন্ত্রের পথে উত্তরণ ঘটানো যাবে। এই সবকিছু দ্রুত সময়ের মধ্যে করা সম্ভব বলেও মনে করছি। সরকার যে নির্ধারিত সময় দিয়েছে, তার মধ্যেই এই সকল কার্যক্রম করে নির্বাচনের দিকে যাওয়া সম্ভব। তবে নির্বাচনের আগে অবশ্যই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উত্তরণ ঘটাতে হবে। এককভাবে সরকারের পক্ষে এ কাজ করা সম্ভব নাও হতে পারে। তাই রাজনীতিক দল, সামাজিক শক্তি এবং অভ্যুত্থানের শক্তিগুলোকে সে ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে হবে।
মঙ্গলবার হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের রূপসী বাংলা গ্র্যান্ড বলরুমে এনসিপি ইফতারের আয়োজনে এসব কথা বলেন তিনি। ‘ফ্যাসিবাদবিরোধী রাজনীতিক, ছাত্র-শ্রমিক, পেশাজীবী, অ্যাক্টিভিস্ট, ওলামায়ে কেরাম ও বিশিষ্ট নাগরিকদের সম্মানে এ ইফতারের আয়োজন করা হয়।
অন্তর্বর্তী সরকার জাতীয় ঐক্যমত্য কমিশনের মাধ্যমে চালানো সংস্কার কার্যক্রমের বিষয়ে নাহিদ ইসলাম বলেন, তাদের প্রস্তাবিত জুলাই সনদ আমরা দ্রুত কার্যকর দেখতে চাই। সে বিষয়ে আমরা সবাই সহযোগিতা করবো। জুলাই সনদ কার্যকরের মাধ্যমে সংস্কারের রূপরেখা আমাদের সামনে স্পষ্ট হবে।
নির্বাচনের জন্য সেনাবাহিনী, পুলিশ, আমলাতন্ত্র ও মিডিয়ার নিরপেক্ষতা প্রয়োজন উল্লেখ করে তিনি বলেন, জনপরিসরে নারীর নিরাপত্তা, নারীর প্রতি সহিংসতার বিরুদ্ধে আইনগত ও সামাজিক উদ্যোগ সরকারের পক্ষ থেকে নিতে হবে এবং দুর্নীতি ও চাঁদাবাজী বন্ধে সরকারকে আরও কঠোর হতে হবে। আমরা সাম্প্রতিক সময়ে দেখছি, কিছু গোষ্ঠী বাংলাদেশ ও ইসলাম ধর্মকে নেতিবাচকভাবে বিশ্বে উপস্থাপনের চেষ্টা করছে। তাই সন্ত্রাস ও উগ্রবাদীদের বিরুদ্ধে আমাদের কঠোর অবস্থান দেখাতে হবে সরকারের পক্ষ থেকে এবং আমাদের সামাজিক ও রাজনৈতিক জায়গা থেকেও সেই অবস্থান দেখাতে হবে।
বাংলাদেশের পুনর্গঠন একদিনে সম্ভব নয় মন্তব্য করে নাহিদ ইসলাম বলেন, একটা দীর্ঘ সময় জঞ্জাল ছাপের মাধ্যমে বাংলাদেশকে পরিবর্তন করা এবং জনগণের কল্যাণ সাধন সম্ভব। আমরা পুরনো রাজীনীতিতে যেতে চাই না, আমরা রাজনৈতিক সংস্কৃতির আমুল পরিবর্তন চাই। জুলাইর আকাঙ্খা ধারণ করে সাবই মিলে আমরা একটা বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়বো, সেই প্রত্যাশা ব্যক্ত করছি।
এনসিপি বাংলাদেশের শাসন কাঠামোর পরিবর্তন চায় উল্লেখ দলটির আহ্বায়ক বলেন, শাসন কাঠামোর মৌলিক ও গুণগত পরিবর্তনের মাধ্যমে দেশের সাংবিধানিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ভিত্তি স্থাপন করতে চায় এনসিপি। তাই একটি নতুন সংবিধানের মাধ্যমে একটি নতুন রিপাবলিকের কথা বলছি আমরা। ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার বিলোপ করে নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। ফ্যাসিবাদের দোসরদের দ্রুত ও দৃশ্যমান বিচার আমরা দেখতে চাই। বিচারের মাধ্যমে আমরা আওয়ামী লীগের রাজনীতির ফয়সালা করতে চাই এবং গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে জনগণ আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে ৫ আগস্ট রায় দিয়েছিল।
জুলাই শহীদদের আত্মার মাগফিরাত ও আহতদের সুস্বাস্থ্য কামনা করে জাতীয় নাগরিক পার্টির-এনসিপি আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, এই ইফতারে ফ্যাসিবাদবিরোধী ও গণতন্ত্রকামী রাজনীতিক ও ছাত্র নেতারা, পেশাজীবীসহ নাগরিক সমাজের নেতারা উপস্থিত হয়েছেন। তাদের সবার প্রতি আমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। জুলাই গণঅভ্যুত্থান আজকে এমন প্রেক্ষাপট তৈরি করেছে, যেখানে আমরা নির্দ্বিধায় এক হতে পারছি, কথা বলতে পারছি এ জন্য আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করছি।
রমজানে আত্মশুদ্ধি ও সংযমের শিক্ষার বিষয়টি তুলে ধরে তিনি বলেন, পারস্পরিক সৌহার্দ ও শ্রদ্ধাবোধ অনুশীলনে আরো সহায়ক হবে। তাই সমাজের বিভিন্ন অংশীজনের সঙ্গে আরো বেশি মিথস্ক্রিয়া ও সংলাপের একটি সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের গণতন্ত্রকামী ছাত্র-জনতার সম্মিলিত প্রতিরোধের ফসল। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতৃত্বে ফ্যাসিবাদবিরোধী রাজনৈতিক দল, ছাত্র সংগঠন, নাগরিক সমাজ, পেশাজীবী, আলেম সমাজসহ সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ ও সহায়তায় এই গণঅভ্যুত্থানে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা সরকারকে উৎখাত করা সম্ভব হয়েছে। আন্দোলনে ভূমিকা পালন করেছেন সাধারণ ছাত্রছাত্রীরা। বিশেষ করে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় ও মাদরাসার অসীম সাহসী ভূমিকা গণঅভ্যুত্থানকে চূড়ান্ত রূপ দিতে সহায়তা করেছে।
গণঅভ্যুত্থানে কারো অবদান কারো থেকে কম নয় উল্লেখ করে নাহিদ ইসলাম বলেন, জুলাই আমাদের নতুন বাংলাদেশের ঐক্য ও মিলনের জায়গা তৈরি করেছে। মুক্তিযুদ্ধের সাম্য, ন্যায়বিচার ও মানবিক মর্যাদার আকাঙ্ক্ষা এই অভ্যুত্থান নতুন করে আমাদের মধ্যে জাগ্রত করেছে। আমাদের মধ্যে নানা বিষয়ে মতপার্থক্য হতে পারে, নীতিগত বিরোধী হতে পারে, তর্ক-বিতর্ক হতে পারে। কিন্তু গণতান্ত্রিক সম্পর্ক, সংলাপ এবং মিথস্ক্রিয়া যাতে এগুলো ছেদ না করে। জাতীয় ঐক্য ছাড়া ফ্যাসিবাদকে সম্পূর্ণভাবে বিলোপ করা বা পরাস্ত করা সম্ভব নয়। আমরা যাতে ভুলে না যাই, দেশের বিপদ এখনো কাটেনি। বাংলাদেশবিরোধী শক্তিরা এখনো ষড়যন্ত্র করে যাচ্ছে।
তিনি বলেন, রাজনীতিবিদ এবং অভ্যুত্থানের শক্তিদের মধ্যে অনৈক্য সামরিক-বেসামরিক আমলাতন্ত্র, মাফিয়া-লুটেরা, ব্যবসায়িক শ্রেণি ও ষড়যন্ত্রকারী নানা বৈদেশিক শক্তিকে সুযোগ করে দিতে পারে। তাই আমরা যাতে এ বিষয়ে সব সময় সচেতন থাকি। আমাদের মধ্যে নীতিগত বিরোধ হবে কিন্তু জুলাই গণঅভ্যুত্থান আমাদের মধ্যে যে ঐক্যের জায়গা তৈরি করেছে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে ও গণতন্ত্রের পক্ষে সেই জায়গা থেকে কখনোই সরে যাব না।
ইফতারে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ, শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানী, নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক, ছাত্রদলের সভাপতি রাকিবুল ইসলাম ও সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীনসহ বিভিন্ন দলের শীর্ষ নেতারা অংশ নেন।
ইফতারে আরও বক্তব্য রাখেন এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন ও মূখ্য সংগঠক(দক্ষিণাঞ্চল) হাসনাত আব্দুল্লাহ। এনসিপির ইফতারে অংশ নেন চিন্তক ফরহাদ মজহার, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা জয়নুল আবেদী ও মাহবুব উদ্দিন খোকন, যুগ্ম মহাসচিব শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এনি, জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল হালিম, নির্বাহী পরিষদ সদস্য মতিউর রহমান আকন্দ, ইসলামী আন্দোলনের প্রেসিডিয়াম সদস্য আলী আশরাফ আকন, গাজী আতাউর রহমান, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক, নাগরিক ঐক্যের সভাপদত মাহমুদুর রহমান মান্না, জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের নায়েবে আমির আবদুর রব ইউসুফী, এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান ফুয়াদ, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক, গণঅধিকার পরিষদের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হাসান আল মামুন প্রমুখ। ছিলেন ছাত্রদল সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব, সাধারণ সম্পদক নাছিরউদ্দিন, ইসলামী ছাত্রশিবিরের দপ্তর সম্পাদক সিগবাতুল্লাহ প্রমুখ।
ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি শহিদুল ইসলাম, মাসুদ কামালসহ জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকরা অংশ নেন ইফতারে।
জাতীয় নাগরিক কমিটির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক আলী আহসান জুনায়েদ, গণতান্ত্রিক ছাত্রসংসদের কেন্দ্রীয় আহবায়ক আবু বাকের মজুমদার, সদস্যসচিব জাহিদ আহসান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আহবায়ক আব্দুল কাদের, লেখক মূসা আল হাফিজ, ধর্মীয় আলোচক হাবিবুর রহমান মিসবাহ, গুম হওয়া সাবেক লেফটেন্যান্ট কর্ণেল হাসিনুর রহমান, সাংবাদিক মাসুদ কামাল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী অংশ নেন।
Comments 0